সঞ্জিব দাস,গলাচিপা (পটুয়াখালী)প্রতিনিধি।।
গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি, ত্যাগী, পোড়খাওয়া, আওয়ামী লীগের কান্ডারী, জীবন্ত কিংবদন্তি নেতা কাজী শহিদ আওয়ামী রাজনীতি থেকে দূরে কেন?- এমনই প্রশ্ন উঠছে উপজেলার তৃণমূল আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মধ্যে থেকে।
জীবনের প্রায় পুরো সময়টাই তিনি আওয়ামী রাজনীতির পিছনে ব্যয় করেছেন। সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হয়েও অর্থের প্রতি ছিল না তাঁর কোন লোভ-লালসা। মানুষকে সব সময় দিয়েছেন, নিতে শিখেন নি। রাজনীতি করতে গিয়ে নিজে অন্য কোন পেশার প্রতি আকৃষ্ট হননি। ফলে নিজের জন্য কিছুই করা হয়নি তাঁর। জীবনে কখনো সুখের স্বপ্ন দেখেন নি। তাঁর স্বপ্ন ছিল শুধু একটাই- বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া।
আজ গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে উপযুক্ত পদে কাজী শহিদকে অধিষ্ঠিত করার দাবি উঠেছে তৃণমূল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। তাঁকে কেন এত দিন আওয়ামী লীগের উপযুক্ত পদ থেকে বঞ্চিত করে দলের বাইরে রাখা হয়েছে?- এমন প্রশ্ন এখন সকলের মুখে মুখে। এর জন্য আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরাই দায়ী, তৃণমূল আওয়ামী লীগ নয়। অতি দ্রæত এ সমস্যার অবসান না হলে কাজী শহিদদের মত শত শত ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতা হাইব্রিড ও তোষামোদিদের ভিড়ে একদিন রাজনীতির অঙ্গণ থেকে হারিয়ে যাবে বলে বিশিষ্টজনরা মনে করছেন।
এভাবে চলতে থাকলে আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত এ অঞ্চলের আওয়ামী লীগ একদিন ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। ১৯৭৩ সালে গলাচিপা সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছাত্রলীগ শাখার শিক্ষানুরাগী সদস্য পদ লাভ এবং পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করার মধ্যে দিয়ে কাজী শহিদের ছাত্র রাজনীতি শুরু। প্রয়াত এমপি আ. বারেক মিয়ার আমলে তিনি গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক, প্রচার সম্পাদক ও সহ-সভাপতি পদের দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সাথে সফলভাবে পালন করেছিলেন।
এছাড়া তিনি ২০১০ সালে কলাগাছিয়া ইউনিয়নের সেকান্দার আলী ডিগ্রি কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, ২০১০ সালে গলাচিপা সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির বিদ্যোৎসাহী সদস্য ও ২০১১ সাল থেকে পর পর দু’বার বকুলবাড়িয়া ইউনিয়নের কল্যাণ কলস নেছারিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি বিভিন্ন সময়ে গলাচিপা উপজেলা ভ‚মি কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়ে ভ‚মিহীণদের পক্ষে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন। যৌবনে তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক কর্মী। এক সময়ে স্কুল-কলেজের কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান তাঁকে ব্যতিত চিন্তাই করা যেত না।
বহুবার তিনি নাটক-থিয়েটারে অভিনয় করে দর্শকের মন কেড়ে নিয়েছেন। তৎকালিন সময়ে কাজী শহীদ অনেক ছাত্রকে রাজনীতির হাতেখড়ি দিয়ে ছাত্রলীগকে শক্তিশালী করেছিলেন। তাঁরাই পরবর্তীতে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ভাইটাল পোস্টে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং বর্তমানে তাঁরা আওয়ামী লীগের বিশেষ বিশেষ পদে অধিষ্ঠিত। রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি জীবনে বহুবার মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন। এমনকি কারাবরণও করেছেন তিনি একাধিকবার। কখনও কখনও দলের হাই কমান্ডের নির্দেশে অনেককে দলে এনে দলকে গতিশীল ও শক্তিশালী করার অগ্রণি ভ‚মিকাও পালন করেছিলেন এই বিচক্ষণ নেতা। এ জন্য দল তাঁর ওপরে রেখেছিল পূর্ণ আস্থা।
দলের সকলেই তাঁকে রাজনীতির মেস মেকার হিসেবে জানতো। রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ ৪৭ বছর পার হওয়ার পরে তাঁর আলোকিত জীবনে হঠাৎ নেমে আসবে রাজনীতির এমন অমাবশ্যার তিমির অন্ধকার তা তিনি কখনও ভাবতেও পারেন নি। গলাচিপা, দশমিনা ও রাঙ্গাবালী উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সর্বত্র মাঠ চষে শততা, নিষ্ঠা ও ত্যাগের মধ্যে দিয়ে নিরলস ও নিঃস্বার্থভাবে একাগ্রচিত্তে দলের জন্য কাজ করে গেছেন দক্ষ ও অবিজ্ঞ রাজনীতিবিদ কাজী শহিদ। দক্ষিণের এ অঞ্চলের মানুষ তাঁকে ক্লিন ইমেজের আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে চেনে ও জানে।
তবুও যেন তাঁর ভারাক্রান্ত হৃদয়ে প্রতি মুহূর্তে বেঁজে চলেছে কান্না ও বেদনার সুর। গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও সাবেক গলাচিপা পৌর মেয়র প্রয়াত হাজী আ. ওহাব খলিফা, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হাজী মু. মজিবর রহমান, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত মুহাম্মদ শাহজাদা ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সরদার মুহাম্মদ শাহ আলম এঁরা সকলেই তাঁর রাজনীতির ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ছিলেন। এক সময় এঁরা একজোট হয়ে প্রাণ খুলে মনের আনন্দে আওয়ামী রাজনীতির মঞ্চে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের গান গেয়ে মঞ্চ কাঁপিয়েছেন।
কাজী শহিদের সহযোদ্ধাদের মধ্যে আজ যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁরা আওয়ামী লীগের বিশেষ বিশেষ পদে থেকে সম্মানের সাথেই দলের জন্য কাজ করছেন। কিন্তু কজনইবা কাজী শহিদের খবর রাখছেন। আওয়ামী রাজনীতির অনেক চড়াই-উৎরাই পার হয়ে জীবনের শেষ দিকে এসে আজ কাজী শহিদ রাজনীতির নিঃসঙ্গতায় ভুগছেন। গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাবেক এমপি প্রয়াত আ. বারেক মিয়া, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আ. বারেক ঢালী এবং সাবেক বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কার্য নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য আলহাজ্ব আখম জাহাঙ্গীর হোসাইন কাজী শহিদকে কখনোই ছোট করে দেখেন নি।
বরং তাঁর সততার জন্য সকলেই তাঁকে ভাল বেসেছেন। দলে পুনরায় সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করার ইচ্ছা আছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কাজী শহিদ বলেন, ‘বর্তমানে দলে আমাদের মত নেতাদের আগের মত সেই মূল্যায়ন নেই। এক সময় বারেক মিয়া, বারেক ঢালী ও জাহাঙ্গীর ভাইয়ের আমলে রাজনীতি করে অনেক আনন্দ ও মূল্যায়ন পেয়েছি। সেদিন আর কখনো ফিরে আসবে বিনা জানি না। শেষ বয়সে দলের জন্য কিছু করতে পারলে সেটাই হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণের সার্থকতা।’
আমাদেরবাংলাদেশ.কম/শিরিন আলম